সাধারণত নির্দিষ্ট বয়সের পর মানুষের চুলে পাক ধরতে শুরু করে। তখন মুখের অবয়ব দেখেই বয়সের ছাপ বোঝা যায়। কিন্তু বয়স হওয়ার আগেই যদি চুলে পাক ধরে, তাহলে তা স্বাভাবিক নয়—এটি শরীরে বড় ধরনের কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে।
পুষ্টির ঘাটতির সমস্যা অনেক সময় সহজে চোখে পড়ে না। ধীরে ধীরে এই ঘাটতি বাড়তে বাড়তে একসময় জটিল রোগের রূপ নিতে পারে। শুরুতে উপসর্গ এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে, অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। ফলে মানসিক চাপ, ব্যস্ত জীবনযাপন বা বয়সজনিত কারণ ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যান। অথচ বাস্তবে একেকটি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির পেছনে থাকে একেক ধরনের শারীরিক সংকেত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামগ্রিকভাবে সুস্থ থাকতে শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজের উপস্থিতি জরুরি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান, রজোনিবৃত্তি ও হরমোনের পরিবর্তনের সময় এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের শক্তি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, হাড়ের স্বাস্থ্য ও রক্তাল্পতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিতে কী ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে—
সোডিয়াম
সোডিয়ামের ঘাটতিতে ঘন ঘন মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, পেশিতে টান, মাথা ঘোরা ও নিম্ন রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম, কম লবণযুক্ত খাবার বা বেশি পানি পান করলে এ ঘাটতি বেশি হয়।
ম্যাগনেশিয়াম
একটানা ক্লান্তি, পেশিতে টান, দুর্বলতা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, হাত-পায়ে অসাড়তা, অনিদ্রা, উৎকণ্ঠা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব ও পিরিয়ডের আগে মেজাজ খারাপ—সবই ম্যাগনেশিয়ামের অভাবে হতে পারে।
পটাশিয়াম
পটাশিয়ামের ঘাটতিতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, পেশিতে টান ধরে, হাত-পায়ে ঝিঁঝি ভাব বা অসাড়তা দেখা দেয়। পাশাপাশি অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, কোষ্ঠকাঠিন্য ও গায়ে শক্তি না থাকার সমস্যাও হতে পারে।
ক্যালশিয়াম
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের ক্যালশিয়ামের ঘাটতি বেশি দেখা যায়। এতে হাড় দুর্বল হওয়া, পায়ে ব্যথা, গাঁটে যন্ত্রণা, নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া, দাঁতের সমস্যা ও ঘন ঘন চোট লাগার প্রবণতা বাড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা ও স্মৃতিভ্রমও দেখা দিতে পারে।
জিংক
জিংকের ঘাটতিতে চুল পড়া, নখ ভেঙে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক হওয়া, ব্রণ, ক্ষত শুকাতে দেরি, সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া, খিদে কমে যাওয়া ও স্বাদ-ঘ্রাণের অনুভূতি কমে যেতে পারে। গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় এ ঘাটতি বেশি হয়।
আয়রন
ঋতুস্রাবের কারণে অধিকাংশ নারীর শরীরেই আয়রনের ঘাটতি দেখা যায়। এর ফলে সারাক্ষণ ক্লান্তি, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, মনোযোগের অভাব ও চুল ঝরে পড়ার সমস্যা দেখা দেয়।
আয়োডিন
আয়োডিনের ঘাটতিতে হাইপোথাইরয়েডিজমের ঝুঁকি বাড়ে। এতে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, ঠান্ডা লাগা, ত্বক শুষ্ক হওয়া এবং ঋতুস্রাবের অনিয়ম দেখা দিতে পারে।
কপার
কপারের ঘাটতিতে রক্তাল্পতা, দুর্বলতা, সংক্রমণ, হাতে-পায়ে ঝিঁঝি ভাব, চুল পেকে যাওয়া, হাড়ের শক্তি কমে যাওয়া ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সেলেনিয়াম
সেলেনিয়ামের অভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। চুল পাতলা হয়ে আসা, পেশিতে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও থাইরয়েডজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকিও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অকালপক্ব চুল বা শরীরের এসব লক্ষণ অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
