শরীরের উপকারের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে মধু। মন খারাপ, চাপ বা উদ্বেগের সময়ে অনেকেই খাওয়া–দাওয়ার বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়েন। অথচ এ সময় সঠিক খাবার মানসিক অবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণত ভালো মেজাজ বজায় রাখতে তাজা মাছ, ফল ও সবজির কথা বলা হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক মিষ্টি উপাদান মধুও মন ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে। মধুর ভেতরে থাকা নানা পুষ্টি উপাদান ও প্রাকৃতিক গুণাগুণ মস্তিষ্ক ও আবেগের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধু প্রাকৃতিক শর্করার ভালো উৎস। এতে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ ধীরে ধীরে শরীরে শক্তি জোগায়। রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, যা খিটখিটে ভাব, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। পরিমিতভাবে মধু খেলে রক্তে শর্করার ওঠানামা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে, ফলে মানসিক চাপ সামলানো সহজ হয়।

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গে মনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মধুতে থাকা প্রিবায়োটিক উপাদান উপকারী অন্ত্রজীবাণুকে পুষ্টি জোগায়। এসব জীবাণু শরীরে সেরোটোনিন উৎপাদনে সহায়তা করে, যা ভালো লাগার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সারাক্ষণ যোগাযোগ চলে, তাই অন্ত্রের ভারসাম্য ঠিক থাকলে মানসিক অবস্থাও তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে। পাশাপাশি মধুর হালকা জীবাণুনাশক গুণ ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

মানসিক ক্লান্তি বা দীর্ঘদিনের অবসাদী ভাবের পেছনে শরীরের ভেতরের অক্সিডেটিভ চাপও দায়ী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক পুষ্টিবিদের মতে, মধুতে থাকা পলিফেনল ও ফ্লাভানয়েড শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা মস্তিষ্কের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। অক্সিডেটিভ চাপ স্নায়ু সংকেতের আদান–প্রদান ব্যাহত করে, ফলে মানসিক ঝাপসা ভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। মধু এই ক্ষতিকর প্রক্রিয়া কমাতে সহায়তা করে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী হালকা প্রদাহ বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মধুর বিভিন্ন উপাদান প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। প্রদাহ কমলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া বজায় থাকে এবং শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়াও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

তবে মধু উপকারী হলেও অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়। পুষ্টিবিদদের মতে, মধু মূলত শর্করার উৎস হওয়ায় দিনে এক থেকে দুই চা-চামচের বেশি না খাওয়াই ভালো। চিনি বা পরিশোধিত মিষ্টির বিকল্প হিসেবে মধু ব্যবহার করাই স্বাস্থ্যসম্মত।

পুষ্টিবিদরা আরও বলেন, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে মধু খেলে রক্তে শর্করা আরও স্থিতিশীল থাকে। দই, ওটস বা ফলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে স্বাদ বাড়ার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যেতে পারে।

সব মধু একরকম নয়। কম প্রক্রিয়াজাত বা কাঁচা মধুতে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। কেনার সময় উপাদানের তালিকায় যেন শুধু ‘মধু’ লেখা থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সময় গড়ালে মধু জমে গেলেও তা নষ্ট হয় না। হালকা গরম পানিতে বোতল রেখে দিলে মধু আবার তরল হয়ে যায়।