শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুম হিটার এখন অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তবে হিটার কেনা আর সঠিক হিটার বেছে নেওয়ার মধ্যে রয়েছে বড় পার্থক্য। উষ্ণতা দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খরচ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাতাসের মান ও ব্যবহারিক আরামের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেন হিটার কেনা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়
বাজারে গেলেই দেখা যায় নানা ধরনের হিটার—অয়েল-ফিলড রেডিয়েটর, কনভেকশন, কোয়ার্টজ, হ্যালোজেন, সিরামিক কিংবা ফ্যান হিটার। সঙ্গে থাকে ওয়াটেজ, এনার্জি এফিশিয়েন্সি, থার্মোস্ট্যাট, ইকো মোডের মতো নানা টার্ম। দামের পার্থক্যও চোখে পড়ার মতো, কিন্তু কোন প্রযুক্তি কেন বেশি দামী—তা অনেক সময় পরিষ্কার বোঝা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল হিটার কিনলে শীত শেষে বিদ্যুৎ বিলই হয়ে উঠতে পারে বড় দুশ্চিন্তার কারণ। আবার কম দামের অনেক হিটারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ফিচার না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে। যেহেতু শীতকালে হিটার প্রায় প্রতিদিন ও দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা হয়, তাই দীর্ঘমেয়াদি দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
রুম হিটারের ধরন ও ব্যবহার
অয়েল-ফিলড রেডিয়েটর: ভেতরের তেল গরম করে ধীরে ধীরে ঘরে তাপ ছড়ায়। শব্দহীনভাবে চলে, বন্ধ করার পরও কিছু সময় উষ্ণতা ধরে রাখে এবং বাতাসের অক্সিজেন কমায় না। তবে ঘর গরম হতে সময় লাগে।
কনভেকশন হিটার: বাতাস গরম করে স্বাভাবিক প্রবাহে তাপ ছড়ায়। আকারে ছোট, বহনযোগ্য এবং ছোট ও বন্ধ ঘরের জন্য কার্যকর।
কোয়ার্টজ হিটার: খুব দ্রুত গরম হয় ও তাৎক্ষণিক তাপ দেয়। বাথরুম বা স্টাডি রুমের জন্য উপযোগী হলেও পুরো ঘর সমানভাবে গরম করে না।
হ্যালোজেন হিটার: কোয়ার্টজের মতো কাজ করে, অনেক সময় দোলানোর সুবিধা থাকে। তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচে সরাসরি তাপ দেয়।
সিরামিক হিটার: সিরামিক রড ও ফ্যান ব্যবহার করে দ্রুত ও সমানভাবে ঘর গরম করে। তুলনামূলক নিরাপদ এবং তাপ ধরে রাখে।
ফ্যান হিটার বা ব্লোয়ার: সবচেয়ে প্রচলিত ও কম দামের হিটার। দ্রুত গরম করলেও শব্দ বেশি হয় এবং বাতাস শুষ্ক করে, যা ত্বক ও শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী হিটার বাছাই
সব হিটার সব ঘরের জন্য উপযোগী নয়। ছোট ঘরের জন্য যে হিটার যথেষ্ট, বড় ঘরে তা কার্যকর নাও হতে পারে। ঘরের আয়তনের পাশাপাশি জানালার সংখ্যা, ছাদের উচ্চতা, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ও ঘরের অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে।
হিটার সব সময় আসবাব, পর্দা বা বিছানা থেকে অন্তত দুই ফুট দূরে রাখতে হবে। ঘরে নিরাপদভাবে রাখার পর্যাপ্ত জায়গা আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক ওয়াটেজ ও নিরাপত্তা
সাধারণভাবে প্রতি বর্গফুট ঘরের জন্য প্রায় ১০ ওয়াট শক্তি প্রয়োজন। তবে অতিরিক্ত ওয়াটেজ ছোট ঘরে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ ও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে টিপ-ওভার প্রোটেকশন, ওভারহিট প্রোটেকশন, কুল-টাচ বডি, সেফটি গ্রিল ও চওড়া বেস থাকা জরুরি। আইএসআই বা সমমানের সার্টিফিকেশন থাকলে নিরাপত্তা মান নিশ্চিত হয়।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও স্বাস্থ্য
রুম হিটার দীর্ঘ সময় চালালে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ে। থার্মোস্ট্যাট, ইকো মোড ও টাইমারযুক্ত হিটার তুলনামূলক সাশ্রয়ী। অয়েল-ফিলড ও সিরামিক হিটার সাধারণত বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বলে ধরা হয়।
কিছু হিটার বাতাস শুষ্ক করে অক্সিজেন কমাতে পারে, যা ত্বক, চোখ ও শ্বাসযন্ত্রে সমস্যা তৈরি করে। হাঁপানি রোগী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য মৃদু ও স্থির তাপ দেওয়া হিটার বেশি নিরাপদ।
শব্দ ও বহনযোগ্যতা
শোবার ঘর বা অফিসের জন্য শব্দের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। অয়েল-ফিলড হিটার প্রায় শব্দহীন, কনভেকশন হিটারে শব্দ কম, আর ফ্যান ও সিরামিক হিটারে শব্দ তুলনামূলক বেশি। একাধিক ঘরে ব্যবহার করতে চাইলে হালকা ও চাকা বা হ্যান্ডেলযুক্ত হিটার সুবিধাজনক।
সব মিলিয়ে, সঠিক রুম হিটার বেছে নিতে হলে ঘরের আয়তন, ওয়াটেজ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শব্দ—সব দিক একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। নিরাপত্তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষমতাই হোক প্রথম অগ্রাধিকার। সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে শীতের দিনগুলো কাটবে উষ্ণ, আরামদায়ক ও নিশ্চিন্তে।
