বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ১৯৭৫ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি প্রথমে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে উন্নীত করেন ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর। পরে বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিযুক্ত হন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল।
জিয়াউর রহমান তাঁর বৈদেশিক নীতিতে যেসব পরিবর্তন সাধন করেন, তার ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক, যিনি আগস্টের (১৯৭৫) পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে চীন, পাকিস্তান ও সৌদি আরব নতুন সরকারকে স্বীকৃতি জানিয়েছিল। আর এভাবেই মুজিব-পরবর্তী বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি চীন, সনাতন মুসলিম বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা বলে লক্ষ করা যায়। সৌদি আরব ও চীনের স্বীকৃতি আসে প্রথমবারের মতো। এবং এসব স্বীকৃতির ব্যাপারে নতুন সরকারের আগ্রহ দেখে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশ ভারত-সোভিয়েত অক্ষ থেকে বের হয়ে আসছে।
জিয়ার বৈদেশিক নীতির দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চীনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও সনাতন আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন। একই সাথে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অবনতি ঘটে ওই সময়সীমায়। এই দুটো দেশের মাঝে সম্পর্কের অবনতির জন্য দুটো জিনিস কাজ করেছিল। এক. মুজিবপছি গেরিলাদের ভারতে আশ্রয় ও সেখান থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাশকতামূলক তৎপরতা চালানো এবং দুই. ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া। ভারত একতরফাভাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পরিণত হয় মরুভূমিতে। ফারাক্কার প্রশ্নে ভারতের সাথে কোনো আপস ফরমুলায় উপনীত হতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে ৪২ জাতি ইসলামি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে প্রশ্নটি উত্থাপন করে।
একইভাবে ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে বাংলাদেশ ফারাক্কা প্রশ্নটি আবারও উত্থাপন করে। ২৮ পরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে প্রশ্নটি উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কয়েকটি মিত্রদেশের অনুরোধে ভারত ঢাকায় একটি বৈঠকে বসতে রাজি হয়। চীন বাংলাদেশের বক্তব্য সমর্থন করেছিল, আর সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থন করেছিল ভারতের। পরে ভারতে জনতা সরকারের আমলে ১৯৭৭ সালে ঢাকায় দুই দেশের মাঝে ৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে ভারত ও বাংলাদেশ যথাক্রমে ৩৭.৫ ও ৬২.৫ ভাগের ভিত্তিতে যথাক্রমে ২০৮০০ কিউসেক ও ৩৪৭০০ কিউসেক পানি গ্রহণে রাজি হয়।
দুই বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক দেশ, চীন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, এই দুটো দেশের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে জিয়া চীনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি চীন সফর করেন। ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়া চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নত করে বাংলাদেশের নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে উঠতে চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জিয়া অস্ত্র ও সেনা প্রশিক্ষণের ব্যাপারে চীনের দিকে ঝুঁকেছিলেন। এই ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, চীনের সাথে এ অঞ্চলের সম্পর্কের ভিত্তি ঐতিহাসিক। ইতিহাসে একজন চীনা নাবিক ঝেং হের নাম জানা যায়, যিনি ৬০০ বছর আগে (১৪৩৩-১৪৬৩) ‘বাণিজ্য কূটনীতির’ মাধ্যমে এই অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সফল কূটনীতিক। চীন তার এই ভূমিকাকে স্মরণ করে।
বলা যেতে পারে ঝেং হে’র (প্রকৃত নাম মা হে) পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চীন আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্যে ২০০১ সালে তার কুনমিং উদ্যোগ এর কথা ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ের সাথে ‘উষ্ণ’ সম্পর্ক বজায় না থাকলেও, বাংলাদেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখে। ব্যক্তিগতভাবে সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে জিয়ার একটা অপছন্দের কথাও জানা যায়। তিনি এক সাক্ষাৎকারে যেভাবে মস্কো টাইপ সমাজতন্ত্র, বিদেশতন্ত্র কিংবা বাকশালতন্ত্র-এর কথা উল্লেখ করেছেন, তাতে তিনি পরোক্ষভাবে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তাঁর অপছন্দের কথাই বলতে চেয়েছেন।
১৯৭৭ সালে বগুড়া ও ঢাকায় যে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান হয়, সেই অভ্যুত্থানের জন্য জিয়া পরোক্ষভাবে ভারতকে দায়ী করেন। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার অনুষ্ঠান করা ও বিচারে দোষী ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করে। আসলে শেখ মুজিবের পতনের পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের ব্যাপারে সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। জিয়ার আমলে কোনো উচ্চপর্যায়ের সোভিয়েত সরকারি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসেনি। প্রটোকল অনুযায়ী কিছু কিছু দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল মাত্র। উপরন্তু ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন প্রশ্নে বাংলাদেশ যে ভূমিকা পালন করেছিল (ইসলামি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন আহ্বান করা, জাতিসংঘে সোভিয়েত আগ্রাসনের সমালোচনা করা ইত্যাদি) তাতে করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল।
জিয়ার বৈদেশিক নীতির একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে আরব বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি হচ্ছে ধর্ম। এই ধর্মীয় বন্ধনের কারণে তিনি ইসলামি বিশ্বের সাথে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে ইসলামের ব্রিজস্বরূপ।
শুধু তা-ই নয়, তিনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার যে ধারা সংযোজিত ছিল, তা বাতিল করে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধের নীতি সংযোজন করেন (পঞ্চম সংশোধনী)। এটা ছিল একটা বড়ো ধরনের পরিবর্তন। এর উদ্দেশ্যে ছিল সনাতন আরব দেশগুলোকে বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহ বাড়ানো। এসব পরিবর্তনের ফলে ইসলামি বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। জিয়ার শাসনামলেই বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করে। জেরুজালেম ও ‘প্যালেস্টাইন সমস্যা সমাধানের ভিত্তি’ হিসাবে আল কুদুস্ কমিটিতেও বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনে (১৯৮১) ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটিরও অন্যতম সদস্য ছিল বাংলাদেশ। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার করার ব্যাপারে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার বৈঠকে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিয়ার শাসনামলে আরব দেশগুলো থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের ব্যাপক কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের একটিতে নির্বাচিত হয়। জিয়া দক্ষিণ তা দেখে যেতে পারেননি। এশিয়া সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ গঠনের চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।
জিয়ার আমলে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর কারণ মূলত দুটো। এক. জিয়াউর রহমান সমাজতান্ত্রিক নীতি পরিত্যাগ করেছিলেন এবং দুই. তিনি বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপারে উদারনীতি গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ জেনারেল জিয়ার শাসনামলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যে-বক্তব্য দেয়, তা ছিল অনেকটা মার্কিন অবস্থানের অনুরূপ। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিতর্কিত বিষয় ছিল না। কার্টার প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় পরমাণুমুক্ত অঞ্চল ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছিল। বাংলাদেশ এ দাবি সমর্থন করেছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ সম্পর্কিত এনপিটি (NPT) চুক্তিকে স্বাক্ষর করেছিল।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ মার্কিন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘পিসকোর’কে বাংলাদেশে কাজ করতে অনুমতি দেয়, যদিও ওই সংস্থা বাংলাদেশে অনেক পরে কাজ শুরু করে এবং এক সময় বাংলাদেশ থেকে তাদের কর্মকাণ্ডও গুটিয়ে নেয়। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এ উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। বগুড়া ও ঢাকাতে ওই সময় সেনা-অভ্যুত্থানের অভিযোগে বেশ কিছু সামরিক অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হলে মানবিক অধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র মৃদু অভিযোগ উত্থাপন করেছিল।” কিন্তু সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে তা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং সম্পর্ক আরো উন্নত হয়। ১৯৭৭-৭৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের সময় যখন আইএমএফ বাংলাদেশকে ৯১২ মিলিয়ন ডলারের ঋণ বাতিল করে দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে খাদ্য ও উন্নয়ন সাহায্য দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্য সীমিত আকারের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। ৩২ জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, তা আজও অব্যাহত রয়েছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ রাজনীতির ৫০ বছর গ্রন্থ

