আইসিইউর কাচঘেরা কেবিনে শুয়ে থাকা মানুষটিকে দেখলে প্রথম চোখে মনে হয়, তিনি এখনও বেঁচে আছেন। শরীর উষ্ণ, বুকের ওঠানামা আছে, মনিটরে দেখা যাচ্ছে হৃদস্পন্দনের রেখা। অথচ চিকিৎসকদের ভাষায় তিনি আর জীবিত নন। এই অবস্থার নাম ‘ব্রেন ডেথ’। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বাস্তবতা রোগীর স্বজনদের জন্য সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর ও মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা।

ব্রেন ডেথ এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক ও ব্রেনস্টেম স্থায়ীভাবে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়। কৃত্রিম যন্ত্রের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদযন্ত্র সচল রাখা সম্ভব হলেও, মস্তিষ্ক আর শরীরকে কোনো নির্দেশ দিতে পারে না। ফলে বাইরে থেকে জীবনের কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ওই ব্যক্তি মৃত হিসেবে গণ্য হন।

কেন ঘটে ব্রেন ডেথ

মস্তিষ্কের কোষ একবার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। গুরুতর আঘাত বা দীর্ঘ সময় অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সাধারণত যেসব কারণে ব্রেন ডেথ ঘটে, তার মধ্যে রয়েছে—

  • স্ট্রোক
  • হার্ট অ্যাটাক
  • গুরুতর মাথায় আঘাত
  • দীর্ঘ সময় অক্সিজেনের ঘাটতি
  • মস্তিষ্কের টিউমার
  • এনসেফালাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রমণ

কীভাবে ব্রেন ডেথ ঘোষণা করা হয়

ব্রেন ডেথ ঘোষণা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণ করে সাধারণত নিউরোলজিস্টরা ধাপে ধাপে পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। প্রতিটি পরীক্ষার ফল লিখিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, একবার ব্রেন ডেথ নিশ্চিত হলে সেই দিনটিকেই মৃত্যুর তারিখ হিসেবে ধরা হয়, যদিও পরে হৃদযন্ত্র থেমে যায়।

ব্রেন ডেথ ঘোষণার আগে চিকিৎসকেরা মূলত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করেন—
১. চেতনার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি: আলো, শব্দ বা স্পর্শে কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে না।
২. সব রিফ্লেক্স বন্ধ থাকা: চোখে আলো ফেললে পিউপিল সাড়া দেয় না, গ্যাগ রিফ্লেক্সসহ ব্রেনস্টেমের সব প্রতিক্রিয়া অনুপস্থিত থাকে।
৩. স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ার অক্ষমতা: ভেন্টিলেটর ছাড়া নিজে থেকে শ্বাস নেওয়ার কোনো চেষ্টা দেখা যায় না।

কোমা ও ব্রেন ডেথের পার্থক্য

অনেকেই কোমা ও ব্রেন ডেথকে এক মনে করেন। বাস্তবে দুটো একেবারেই আলাদা অবস্থা। কোমায় থাকা রোগীর মস্তিষ্কে কিছু কার্যক্রম থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে তারা জ্ঞান ফিরে পেতে পারেন। কিন্তু ব্রেন ডেথ মানে মস্তিষ্কের সব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেখানে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।

যেসব পরীক্ষা করা হয়

ভুলভাবে ব্রেন ডেথ নির্ণয় এড়াতে প্রথমেই নিশ্চিত করা হয় যে রোগীর শরীরে কোনো ওষুধের প্রভাব নেই, শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা নয় এবং রক্তচাপ স্থিতিশীল। এরপর করা হয়—

  • শারীরিক পরীক্ষা: চোখে তুলা স্পর্শ করা, আলো ফেলা, গলার রিফ্লেক্স পরীক্ষা
  • কোল্ড ক্যালোরিক টেস্ট: কানে ঠান্ডা পানি দিয়ে প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ
  • অ্যাপনিয়া টেস্ট: ভেন্টিলেটর খুলে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা আছে কি না দেখা
  • প্রয়োজনে ইইজি বা ব্রেন ব্লাড ফ্লো পরীক্ষা

ব্রেন ডেথ এক কঠিন ও নির্মম বাস্তবতা, যা মানসিকভাবে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাস ও হৃদস্পন্দন চলতে থাকলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে এটি মস্তিষ্কের মৃত্যু। কোনো পরিবারের পক্ষেই এই সত্য সহজে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।