সারা দেশে জেঁকে বসেছে শীত। কয়েকটি বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বইছে শৈত্যপ্রবাহ, তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৭ থেকে ৮ ডিগ্রিতে। দিনের বেলায়ও অনেক জায়গায় সূর্যের দেখা মিলছে না। আকাশ ও চারপাশ ঢেকে আছে ধূসর রঙের ঘন কুয়াশার চাদরে। শীত মৌসুমে এই ঘন কুয়াশা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
তবে কুয়াশা আসলে কী, কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন শীতকালেই এর প্রকোপ বেশি—এ নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কুয়াশা কীভাবে তৈরি হয়
আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, কুয়াশা হলো ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি তৈরি হওয়া এক ধরনের নিচু মেঘ বা ‘লো ক্লাউড’। বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণেই মূলত কুয়াশার সৃষ্টি হয়। শীতকালে এই প্রক্রিয়াটি বেশি সক্রিয় থাকে।
শীতের সময় তাপমাত্রা কম থাকায় মাটিতে থাকা আর্দ্রতা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসে। বাতাস যখন শিশিরাঙ্কে পৌঁছায়, তখন সেই জলীয় বাষ্প ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। এই জলকণাগুলো বাতাসে ভেসে থাকলেই তৈরি হয় কুয়াশা।
এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, দিনের বেলায় ভূপৃষ্ঠ যে তাপমাত্রা পায়, রাতে তা হারিয়ে যায়। কোনো কারণে ভূপৃষ্ঠ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে গেলে, অর্থাৎ উপরের স্তরের তুলনায় নিচের তাপমাত্রা কম হলে কুয়াশা সৃষ্টি হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশে অনেক সময় দিল্লি, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ অঞ্চল থেকে অ্যাডভেকশন ফগ প্রবেশ করে।
কুয়াশা, মিস্ট ও স্মগ—এক নয়
অনেকে কুয়াশা, মিস্ট ও স্মগকে একই মনে করলেও বাস্তবে এগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্য নির্ভর করে মূলত তৈরির প্রক্রিয়া ও দৃশ্যমানতার ওপর।
মাটির কাছাকাছি বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে জলকণায় পরিণত হলে কুয়াশা সৃষ্টি হয়। সাধারণভাবে দৃশ্যমানতা এক কিলোমিটারের কম হলে তাকে কুয়াশা বলা হয়। একই প্রক্রিয়ায় তৈরি হলেও মিস্ট তুলনামূলক কম ঘন হয়। এতে দৃশ্যমানতা এক কিলোমিটারের বেশি থাকে, তাই একে অনেক সময় হালকা কুয়াশা হিসেবে ধরা হয়।
অন্যদিকে স্মগ হলো ‘স্মোক’ ও ‘ফগ’-এর মিশ্রণ। শিল্পকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়ার সঙ্গে কুয়াশা মিশে স্মগ তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ক্ষতিকর। কুয়াশা ও মিস্ট প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত ঘটনা হলেও স্মগ মূলত মানুষের সৃষ্ট বায়ুদূষণের ফল।
ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের মতে, কুয়াশা চারপাশকে সাদা পর্দার মতো ঢেকে ফেলে এবং দৃশ্যমানতা খুব কমে যায়। মিস্ট তুলনামূলক পাতলা এবং ধূসর আভা তৈরি করে।
কুয়াশা কেন শীত বাড়ায়
আবহাওয়াবিদদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী ঘন কুয়াশাই শীতের তীব্র অনুভূতির প্রধান কারণ। কুয়াশা বেশি সময় ধরে থাকলে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে ঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। ফলে মাটি গরম হয় না এবং দিনের তাপমাত্রা কমে যায়। এতে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যও কমে গিয়ে শীতের অনুভূতি আরও বাড়ে।
কুয়াশা কাটে কীভাবে
কুয়াশা কাটতে হলে কিছু অনুকূল আবহাওয়াগত পরিস্থিতি প্রয়োজন। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, পশ্চিম দিক থেকে আসা ওয়েস্টার্লি ডিসটার্বেন্স বা পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় হলে বাতাসের গতি বাড়ে। এর প্রভাবে মেঘ, বৃষ্টি বা ঝোড়ো হাওয়া তৈরি হতে পারে, যা কুয়াশা কাটাতে সহায়ক।
এ ছাড়া পশ্চিমা লঘুচাপজনিত বৃষ্টিও কুয়াশা দূর করতে সাহায্য করে। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, কুয়াশা কেটে গেলে ঠান্ডার তীব্রতা কমে আসে। বৃষ্টি হওয়া এবং বাতাসের গতিবেগ বাড়াই কুয়াশা কাটার প্রধান উপায়।
তিনি আরও বলেন, বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ বলয় তৈরি হওয়া এবং লোকালাইজড ওয়েস্টার্লি ডিসটার্বেন্সের বর্ধিতাংশ সক্রিয় হলে বাতাসের গতি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ দিন পরপর পশ্চিমা লঘুচাপ হয়। তবে গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পশ্চিমা লঘুচাপ না আসায় বাতাসের আর্দ্রতা সরতে পারছে না। যদিও ছয় জানুয়ারি বাতাস কিছুটা বাড়ায় আর্দ্রতা সামান্য কমেছে।
