শীতকাল শিশুদের জন্য বাড়তি কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আসে। ঠান্ডা আবহাওয়া, দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে অবস্থান এবং মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে এ সময়ে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় তারা শীতে তুলনামূলক বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই এই সময়ে শিশুদের সুস্থ রাখতে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতে ঘরে হিটার বা গরম বাতাস ব্যবহারের ফলে বাতাস শুষ্ক হয়ে যায়। এতে নাক ও গলার ভেতরের অংশ শুকিয়ে গিয়ে জীবাণু সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি শীতে সূর্যালোক কম পাওয়ায় শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা দেয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে।

ঠান্ডা কি সরাসরি অসুখের কারণ?

অনেকেই মনে করেন ঠান্ডা আবহাওয়াই সরাসরি অসুস্থতার কারণ। তবে বাস্তবে ঠান্ডা নিজে থেকে রোগ সৃষ্টি না করলেও এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ভাইরাস সহজে ছড়িয়ে পড়ে। শীতে জানালা বন্ধ রেখে সবাই বেশি সময় ঘরের ভেতরে থাকে, ফলে বাতাস চলাচল কমে যায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি ঠান্ডা বাতাস নাক ও গলার প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে, যার ফলে সর্দি, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেশি দেখা দেয়।

শীতে শিশুদের সুস্থ রাখতে করণীয়

পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করুন
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে—

  • ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল: কমলা, মাল্টা, লেবু, পেয়ারা
  • ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার: ডিম, দুধ, মাছ
  • শাকসবজি: পালং শাক, গাজর, মিষ্টি কুমড়া

শীতকালে সবজি স্যুপ, খিচুড়ি, ওটস বা ডাল-ভাতের মতো গরম খাবার শিশুদের জন্য উপকারী।

পর্যাপ্ত পানি পান করান
শীতে শিশুদের পানির চাহিদা কমে গেলেও শরীরের জন্য পানি সমান গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি নাক ও গলার ভেতরের আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং শরীর থেকে জীবাণু বের করতে সাহায্য করে। হালকা গরম পানি বা ঘরে তৈরি উষ্ণ পানীয় দেওয়া যেতে পারে।

হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
শীতে অসুখ প্রতিরোধে নিয়মিত হাত ধোয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, বাইরে থেকে এলে কিংবা কাশি-হাঁচির পর কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস শিশুদের শেখানো জরুরি।

শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা

শীতে বাইরে খেলাধুলা কম হলেও শিশুদের সক্রিয় রাখা প্রয়োজন। ঘরের ভেতরে নাচ, হালকা ব্যায়াম, দড়ি লাফ বা যোগব্যায়াম করানো যেতে পারে। রোদে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ থাকলে সেটিও উপকারী।

পর্যাপ্ত ঘুমও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

  • প্রি-স্কুল শিশু: ১০–১৩ ঘণ্টা
  • স্কুলগামী শিশু: ৯–১২ ঘণ্টা
  • কিশোর: ৮–১০ ঘণ্টা

ঘুমের আগে মোবাইল বা টিভি ব্যবহার কমানো ভালো।

অতিরিক্ত সতর্কতা

শীতকালে ফ্লু ও ভাইরাসজনিত রোগ বেশি হওয়ায় বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার শেখানো এবং ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

শিশুর মধ্যে টানা তিন দিনের বেশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি বা ডায়রিয়া, শরীরে র‍্যাশ, খাবার বা পানি না খাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

শীতকাল শিশুদের জন্য আনন্দের সময় হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না। সঠিক খাবার, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সচেতন অভিভাবকত্বই পারে শিশুদের শীতকালীন অসুস্থতা থেকে নিরাপদ রাখতে। সামান্য যত্ন ও সচেতনতায়ই শীত হতে পারে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময়।